দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রত্যেক খাতকে গ্রাস করে ফেলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন আর দুর্নীতিমুক্ত নয়। দুর্নীতি এখন শিক্ষাঙ্গনেও হানা দিয়েছে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকার অনুসন্ধানে দুর্নীতির নানা ঘটনা বেরিয়ে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে দুর্নীতির মহা উৎসব। লুটপাট আর দুর্নীতি এখন নিত্য দিনের ব্যাপার। নানা পক্ষ এ দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ছে। 


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক দুর্নীতিতে নেতৃত্বের  ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই দুর্নীতিতে সহযোগিতা করছেন দুর্নীতিগ্রস্থ এক শ্রেণীর শিক্ষকরা। কোন কোন সৎ শিক্ষক বাধা দিতে গেলে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাদের বেতন ভাতা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। কখনো কখনো চাকরীচ্যূত করা হচ্ছে। দুর্নীতির জন্য কাউকে এ পরযন্ত জবাবদিহিতা করতে  হয়নি। আত্মসাৎ  করা অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনাও কখনো ঘটেনি। দুর্নীতি করেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বেকায়দায় পড়তে হয়না। পরিচালনা কমিটি এ ক্ষেত্রে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন।


দুর্নীতিবাজরা নানাভাবে অর্থ হাতিয়ে থাকে। তারা নানা ধরনের উৎস থেকে অর্থ পেয়ে থাকে অবৈধ ভাবে। পূর্বে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিত। নিউশন ফি, খাতা-কলমের ফি, স্কুল ড্রেস, ডায়েরী প্রভৃতির টাকাও আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বর্তমানে এগুলোর সাথে আরো অনেক খাত যুক্ত হচ্ছে। ভনব নির্মাণ, জমি ক্রয়,  গাড়ি ক্রয়, বিভিন্ন মেরামতের কাজ, আসবাবদপত্র ক্রয় ইত্যাদি খাতেও চলছে লুটপাট। প্রতিষ্ঠানের টাকা এবং ব্যাংকে এফডিআর থেকে  কমিশন বাণিজ্য চলছে। 

শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে চলছে কোচিং ব্যবসা। ছাত্র/ছাত্রীরা না পড়তে চাইলেও তাদের বাধ্য করা হচ্ছে স্কুলে কোচিং করার জন্য।

ক্লাশে ঠিকমত পড়ানো হচ্ছেনা। দেখা গেছে একটিমাত্র চাপ্টার পড়িয়ে কয়েকমাস চলে যাচ্ছে। শিক্ষকরা শ্রেণীতে এসে মানসম্মত ক্লাশ নেননা। শ্রেণীতে এসে বেশিরভাগ সময় গল্প গুজব করে  সময় পাড় করে দিচ্ছেন। গণিতে পাটি গণিত,বীজ, জ্যামিতি সকল চাপ্টার ঠিকমতো না পড়িয়ে অনেক জটিল সৃজনশীল প্রশ্ন পরীক্ষা আসলে দেয়া হয়। যার ফলে  পরীক্ষার  ফলাফল ভাল হয়না। শিক্ষার্থী ও অভিবাবকেরা হতাশ হচ্ছেন। গ্রামারের সকল চ্যাপ্টার পড়ানো হচ্ছেনা। বিজ্ঞান, ব্যবসায় ও মানবিকের বিভিন্ন বিষয়গুলো আন্তরিকতার সাথে ক্লাশে পড়ানো হচ্ছেনা।ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং ও প্রাইভেট ছাড়া শুধুমাত্র ক্লাশের পড়ানোতে  ভাল ফলাফলের ভরসা পায়না।   আবার প্রাইভেট শিক্ষক যে নিয়মে বাসায় পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা সেসব নিয়ম মেনে নিচ্ছেননা। যে নিয়মে করতে হবে সে নিয়মও তারা ক্লাশে করাচ্ছেন না। ক্লাশে পাঠদানের ব্যপারে অনেক শিক্ষকই অমনোযোগী। কোন শিক্ষার্থী কোন পড়া জিজ্ঞেস করলে আন্তরিকতার সাথে তা বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছেনা। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধমক দেয়া হচ্ছে। অভিবাবকরা  শিক্ষদের সাথে এখন আর লেখাপড়ার বিষয়ে কথা বলতে সাহস পায়না। গ্রামীণ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন অনেক বেশি কমার্শিয়াল মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। শিক্ষাদান  নয় ব্যবসাই যেন এখন মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এভাবে তারা শিক্ষার্থীদের ব্লাকমেইল করে তাদের মনোনীত শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট অথবা কোচিং করতে বাধ্য করছেন। এসব কোচিং শিক্ষকরা আবার গোপনে জেনে নিচ্ছেন পরীক্ষায়  কিকি আসবে আর কিকি আসবেনা। এভাবে যেসব শিক্ষার্থী ঐ কোচিং শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ছেন শুধু তারাই ভাল  রেজাল্ট করছেন।বাকিরা ভাল পরীক্ষা দিয়েও দেখা যাচ্ছে খারাপ ফলাফল করছেন। বেশিরভাগ এসব দুর্নীতিবাজ শিক্ষকরা পরীক্ষার খাতায় কোথায় কি ভুল হয়েছে তা দেখান না! খাতা  গোপন করে রাখলে তাদের দুর্নীতি করতে সুবিধা হয়। এসব কোচিং সপ্তায় তিন দিন অথবা দুইদিন পড়ানো হয়। তাছাড়া সকল বিষয় সকল ছাত্র/ছাত্রীকে যত্ম নিয়ে পড়ানো হচ্ছেনা।ফলে তাদের গৃহশিক্ষক রাখা ও স্কুলে কোচিং করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। কারণ তারা দুইদিকে বেতন চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ছে।   

কমিশন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকাশনীর নিম্ন মানের বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।এসব প্রকাশনী থেকে শিক্ষকরা মোটা অংকের টাকা কমিশন পেয়ে থাকেন। তাই বুকলিস্টে শিক্ষকরা  তাদের কমিশন প্রাপ্ত প্রকাশনীর বইয়ের নাম লিখে দিচ্ছেন। এসব বইয়ে কাঙ্ক্ষিত অনেক পড়া পাওয়া যাচ্ছেনা। ফলে যেসব অভিবাবক আয় কম তারা একাধিক বই কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই বিষয়ের একাধিক বই ছা্ত্র/ছাত্রীদের বহন করাও একরকম কষ্টকর। 

পত্রিকা গুলোতে অনেক সময় আমরা দেখতে পাই যে শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও মাসিক বেতন ভাতা ঠিকমত পাচ্ছেন।এমনকি শিক্ষক আমেরিকা কিংবা কানাডায় বসে বাংলাদেশে অবস্থিত স্কুল চালাচ্ছেন!

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেত ব্যবহার করতে না দেয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেত ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পাঠদান করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। ছাত্র/ছাত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেনা। কখনো কখনো শিক্ষকের সাথে বেয়াদবির ঘটনা  ঘটছে।  শিক্ষকরা শাসন করলে অভিবাবক এসে শিক্ষককে হুমকি ধমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাঠদানের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে এ পেশায়  আন্তরিকতার সাথে কাজ করা ও শিক্ষক হিসেবে নিজের অস্তীত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে উঠছে । কোন কোন শিক্ষক পরিস্থিতি সামাল দিতে অনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছেন অথবা দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন।   

আমরা বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের দ্বারা অনেক নামিদামি বিদ্যালয়ের ছাত্রী লাঞ্চিত হওয়ার খবর পাই। কখনো কখনো যৌন নির‌্যতনের খবর পাওয়া যায়। যা অগ্রহনযোগ্য  ও অনৈতিক কাজ। শিক্ষকরা এভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ ও নীতিহীন হয়ে পড়লে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বাধ্য। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর শিক্ষা দান করে থাকেন শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষকদের নৈতিক অধপতনের জন্য জাতি মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়বে।শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধাগুলোও দেখতে হবে। শিক্ষাদানের যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে তা নিরসণ জরুরী। শিক্ষকদের বেতন ভাতাদি বাড়ানোর প্রয়োজন হলে বাড়ানোর চিন্তা ভাবনা  করতে হবে। কর্তৃপক্ষকে শিক্ষক ও অভিবাবকদের সাথে কথা বলে সমস্যা  চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। একটি দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন উন্নত শিক্ষার পরিবেশ।